, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, চট্রগ্রাম বন্দর গভীর হচ্ছে অচলাবস্থা।

  • প্রকাশের সময় : ১১ ঘন্টা আগে
  • ১৫ পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।

মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে ঘনীভূত হচ্ছে সংকটের কালো মেঘ। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বন্দর ভবনের পাশে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত শনিবার থেকে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে শ্রমিকরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করছিলেন। আজ মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে সেই কর্মসূচি ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। তবে কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই আন্দোলনের নেতারা একে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন সংবাদ ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, সরকার বন্দরকে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়ে একে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ‘আত্মঘাতী’ চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

আন্দোলনের এই তীব্রতার পেছনে ঢাকার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের খবর বড় ভূমিকা রেখেছে। বিডা (BIDA) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন শ্রমিক নেতারা।

সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে কর্মসূচি শিথিল করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু খবর পেয়েছি ঢাকায় আমাদের নেগোসিয়েশন কমিটিকে চুক্তিতে সই করার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে। কনটেইনার প্রতি দরের পর এখন রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি বন্দরের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।

সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন আরও যোগ করেন, কর্মকর্তাদের ‘আটকে রেখে’ জোর করে সই নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।বিগত কয়েকদিনের কর্মবিরতিতে পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ থাকলেও জাহাজ ভেড়ানো বা বের করার কাজ সচল ছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটেছে।

ডক অফিসে তালা: সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকরা ডক অফিসে হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাদের বের করে দিয়ে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেন।পাইলটিং কার্যক্রম স্থবির: টাগবোটসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় পাইলটরা নির্ধারিত জাহাজগুলো নিয়ে জেটিতে আসতে পারেননি।

জেটিতে আটকা জাহাজ: আজ জোয়ারের সময় জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালে ছয়টি জাহাজ আনা-নেওয়ার কথা ছিল, যার একটিও সম্ভব হয়নি। তবে পতেঙ্গায় আরএসজিটি টার্মিনাল ও কিছু বিশেষায়িত জেটিতে তিনটি জাহাজ আনা-নেওয়া করা গেছে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, একদিন বন্দর অচল থাকা মানে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি। পাশাপাশি আমদানিকৃত কাঁচামাল সময়মতো শিল্পকারখানায় না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং নিত্যপণ্যের দাম বাজারে আকাশচুম্বী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের চেষ্টা করা হলেও শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড়।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল একটি শ্রমিক আন্দোলন নয়, এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বিনিয়োগ বনাম বন্দরের স্বনির্ভরতা—এই দুই মেরুর লড়াইয়ে দেশ আজ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আমাদের ঠিকানা নিউজ। 

জনপ্রিয়

অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, চট্রগ্রাম বন্দর গভীর হচ্ছে অচলাবস্থা।

প্রকাশের সময় : ১১ ঘন্টা আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক।

মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে ঘনীভূত হচ্ছে সংকটের কালো মেঘ। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বন্দর ভবনের পাশে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত শনিবার থেকে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে শ্রমিকরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করছিলেন। আজ মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে সেই কর্মসূচি ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। তবে কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই আন্দোলনের নেতারা একে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন সংবাদ ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, সরকার বন্দরকে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়ে একে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ‘আত্মঘাতী’ চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

আন্দোলনের এই তীব্রতার পেছনে ঢাকার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের খবর বড় ভূমিকা রেখেছে। বিডা (BIDA) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন শ্রমিক নেতারা।

সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে কর্মসূচি শিথিল করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু খবর পেয়েছি ঢাকায় আমাদের নেগোসিয়েশন কমিটিকে চুক্তিতে সই করার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে। কনটেইনার প্রতি দরের পর এখন রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি বন্দরের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।

সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন আরও যোগ করেন, কর্মকর্তাদের ‘আটকে রেখে’ জোর করে সই নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।বিগত কয়েকদিনের কর্মবিরতিতে পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ থাকলেও জাহাজ ভেড়ানো বা বের করার কাজ সচল ছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটেছে।

ডক অফিসে তালা: সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকরা ডক অফিসে হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাদের বের করে দিয়ে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেন।পাইলটিং কার্যক্রম স্থবির: টাগবোটসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় পাইলটরা নির্ধারিত জাহাজগুলো নিয়ে জেটিতে আসতে পারেননি।

জেটিতে আটকা জাহাজ: আজ জোয়ারের সময় জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালে ছয়টি জাহাজ আনা-নেওয়ার কথা ছিল, যার একটিও সম্ভব হয়নি। তবে পতেঙ্গায় আরএসজিটি টার্মিনাল ও কিছু বিশেষায়িত জেটিতে তিনটি জাহাজ আনা-নেওয়া করা গেছে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, একদিন বন্দর অচল থাকা মানে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি। পাশাপাশি আমদানিকৃত কাঁচামাল সময়মতো শিল্পকারখানায় না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং নিত্যপণ্যের দাম বাজারে আকাশচুম্বী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের চেষ্টা করা হলেও শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড়।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল একটি শ্রমিক আন্দোলন নয়, এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বিনিয়োগ বনাম বন্দরের স্বনির্ভরতা—এই দুই মেরুর লড়াইয়ে দেশ আজ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আমাদের ঠিকানা নিউজ।