মহান একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতির আগে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান, এরপর একসঙ্গে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কিন্তু এবার সেই প্রথায় দেখা গেল দৃশ্যমান ব্যতিক্রম। আর এই ব্যতিক্রমী ঘটনায় বর্তমান রাষ্ট্রপতি তার পদে আর থাকছেন না; সেই বার্তা দিচ্ছে বলে আলোচনা উঠেছ।
চলতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ১১টা ৫৮ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাত ১২টা ১ মিনিটে তিনি শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপরই তিনি শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেন। তিনি চলে যাওয়ার পর রাত ১২টা ৫ মিনিটে শহীদ মিনারে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাত ১২টা ৮ মিনিটে তিনি শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আলাদা সময়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের এ ঘটনা রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।সংসদের নতুন অধিবেশন শুরুর পর রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন কিংবা তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হতে পারে; এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, একুশের রাতে শহীদ মিনারের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন রাষ্ট্রপতির বিদায়ের বার্তা বহন করছে।
তাদের মতে, রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী চাইলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একত্রে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারতেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নতুন বিতর্ক উত্থাপন করতে পারত। তাই রাজনৈতিকভাবে একটি ‘দূরত্ব’ বজায় রাখা হয়েছে। আর এই বিষয়টি সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে; রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আর পদে থাকছেন না।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতন হয়।
উৎখাত হওয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার পদে বহাল থাকেন। একই বছর তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে অপসারণ কিংবা তার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি। সে সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রপতিকে স্বপদে বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।পরবর্তী সময়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এরপর আবার আলোচনায় আসে; রাষ্ট্রপতি কি স্বপদে থাকবেন, নাকি নতুন কেউ দায়িত্ব নেবেন।২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সে সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি সরে যেতে চান এবং এ বিষয়ে আগ্রহী। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্ব পালন করা উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় তিনি তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নিজে থেকেই পদত্যাগ করতে পারেন। তবে তিনি যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।নতুন সংসদ সদস্যরা ইতোমধ্যে শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু; রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন কবে এবং কীভাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি যেহেতু আগেই সরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তাই অচিরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শহীদ মিনারের ব্যতিক্রমী আয়োজনকে তারা একটি ‘প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা’ হিসেবেই দেখছেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে সংসদ। আর যদি তিনি পদত্যাগ না করেন, তাহলে অভিশংসনের পথ খোলা রয়েছে। স্পিকার নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন হয়তো স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।রাষ্ট্রপতি অপসারণ ও নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ নিয়ে সংবিধানে যা আছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবেন। সর্বোচ্চ দুইবার রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত থাকা যায়। মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে শূন্য হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। তবে পদত্যাগ বা অভিশংসনের ক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ৩৫ বছর বয়স পূর্ণ এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকলে কেউ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, আমাদের উচিত প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক রীতি মেনে চলা। রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং এরপর তিনি সম্মানজনকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন। এতে নতুন সংসদ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ পাবে।
জনগণ আমাদের বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত একজন রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখা আমাদের সংসদীয় জয়ের স্পিরিটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আমাদের ঠিকানা।